সিনেমাটিক ভিডিওগ্রাফিতে নতুন চমক, ‘রোবট ফোন’ আনল অনার
স্মার্টফোনের প্রচলিত ক্যামেরা প্রযুক্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করে বহুল আলোচিত ‘রোবট ফোন’ বাজারে এনেছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অনার (HONOR)। ফোনটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এর ক্যামেরা শুধু ছবি বা ভিডিও ধারণ করে না, বরং মোটরচালিত গিম্বলের মাধ্যমে নিজেই নড়াচড়া করতে পারে। ফলে অতিরিক্ত গিম্বল বা ক্যামেরা সরঞ্জাম ছাড়াই তুলনামূলকভাবে সিনেমাটিক ভিডিও ধারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ফোনের ভেতরেই রোবটিক গিম্বল
অনারের রোবট ফোনে রয়েছে একটি ৪-ডিগ্রি-অব-ফ্রিডম (4DoF) মোটরচালিত গিম্বল সিস্টেম। এর মাধ্যমে ক্যামেরা নির্দিষ্ট বিষয় বা ব্যক্তিকে অনুসরণ করতে পারে এবং শুটিংয়ের সময় ক্যামেরার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ফোনটির ক্যামেরা সিস্টেমে তিন-অক্ষের গিম্বল স্ট্যাবিলাইজেশন ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ব্যবহারকারীর হাতের কাঁপুনি বা চলন্ত অবস্থায় ভিডিও করার সময়ও ফ্রেমকে তুলনামূলকভাবে স্থির রাখার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
অনারের দাবি, এই প্রযুক্তি বিশেষ করে ভ্লগার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও মোবাইল চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য নতুন ধরনের শুটিং অভিজ্ঞতা দিতে পারে।
২০০ মেগাপিক্সেলের রোবটিক ক্যামেরা
রোবট ফোনের প্রধান আকর্ষণ এর ২০০ মেগাপিক্সেলের গিম্বল ক্যামেরা। ক্যামেরাটি ফোনের ওপরের অংশ থেকে বের হয়ে বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে পারে। পাশাপাশি ডিভাইসটিতে উচ্চ রেজল্যুশনের টেলিফটো ও আল্ট্রাওয়াইড ক্যামেরাও রয়েছে।
এই ক্যামেরা ব্যবস্থা শুধু স্থির ছবি তোলার জন্য নয়; ভিডিও ধারণের সময় বিষয়বস্তুকে অনুসরণ, ক্যামেরা মুভমেন্ট এবং স্থিরতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এক হাতেই সিনেমাটিক শট
ফোনটির অন্যতম আলোচিত ফিচার AI SpinShot। এর মাধ্যমে এক হাতে ফোন ধরে ৯০ বা ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত নির্দিষ্ট ধরনের ঘূর্ণনশীল ক্যামেরা মুভমেন্ট তৈরি করা যায়। অনারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরাও অতিরিক্ত সরঞ্জাম ছাড়াই সিনেমাটিক ধরনের ট্রানজিশন ও মুভমেন্ট তৈরি করতে পারবেন।
এছাড়া AI Object Tracking প্রযুক্তির মাধ্যমে চলন্ত ব্যক্তি বা বস্তুকে ক্যামেরার ফ্রেমে ধরে রাখার সুবিধাও রয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তি হাঁটতে বা নড়াচড়া করতে থাকলেও ক্যামেরা তাকে অনুসরণ করতে পারে।
সিনেমা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনারের অংশীদারত্ব
রোবট ফোনের ভিডিও সক্ষমতাকে আরও উন্নত করতে অনার কাজ করেছে বিখ্যাত জার্মান সিনেমা ক্যামেরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ARRI-এর সঙ্গে। এই সহযোগিতার লক্ষ্য হলো পেশাদার সিনেমাটিক ভিডিওগ্রাফির কিছু প্রযুক্তি ও কালার-সায়েন্স মোবাইল ডিভাইসে নিয়ে আসা।
রোবট ফোনে ARRI-ভিত্তিক সিনেমাটিক প্রযুক্তি, Log-C রেকর্ডিং এবং উন্নত কালার-গ্রেডিং সুবিধার সমর্থন রাখা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে যারা ভিডিও ধারণের পর পোস্ট-প্রোডাকশন বা কালার গ্রেডিং করেন, তাদের জন্য ফোনটি বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কথা মাথায় রেখেই নকশা
বর্তমানে স্মার্টফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভিডিও ব্লগ, শর্ট ভিডিও, ইউটিউব কনটেন্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও তৈরির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এই পরিবর্তিত ব্যবহারধারাকে সামনে রেখেই রোবট ফোনকে ডিজাইন করেছে অনার।
ফোনটির রোবটিক ক্যামেরা ব্যবহারকারীর পরিবর্তে কিছু ক্যামেরা মুভমেন্ট সামলে দিতে পারে। ফলে একা ভিডিও ধারণ করার সময়ও ক্যামেরাম্যান বা আলাদা গিম্বল অপারেটরের প্রয়োজন কমতে পারে।
বিশেষ করে ট্রাভেল ভ্লগার, শর্ট-ফিল্ম নির্মাতা, সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং মোবাইল ফটোগ্রাফারদের জন্য এই প্রযুক্তি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
শুধু ক্যামেরা নয়, এটি AI-নির্ভর স্মার্টফোনও
রোবট ফোনের ধারণাটি শুধু একটি ঘূর্ণনশীল ক্যামেরায় সীমাবদ্ধ নয়। অনার এটিকে embodied AI বা শারীরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
অনারের প্রদর্শিত প্রযুক্তি অনুযায়ী, ফোনটি ব্যবহারকারীর গতিবিধি ও শব্দ শনাক্ত করে ক্যামেরার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। এমনকি ভিডিও কলের সময় ব্যবহারকারীকে অনুসরণ করার মতো সুবিধাও এতে রাখা হয়েছে।
শক্তিশালী হার্ডওয়্যারও রয়েছে
ক্যামেরাকেন্দ্রিক ফিচারের পাশাপাশি ফোনটিতে ফ্ল্যাগশিপ-স্তরের হার্ডওয়্যার দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে Snapdragon 8 Elite Gen 5 চিপসেট, সর্বোচ্চ ১৬ জিবি RAM, ১ টেরাবাইট পর্যন্ত স্টোরেজ এবং প্রায় ৭,০৬০ mAh ব্যাটারি থাকার কথা বলা হয়েছে। ডিসপ্লে হিসেবে রয়েছে প্রায় ৬.৩ ইঞ্চির OLED প্যানেল।
অর্থাৎ, শুধু ক্যামেরা প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়—প্রচলিত ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনের পারফরম্যান্সের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করার মতো হার্ডওয়্যার দেওয়ার চেষ্টা করেছে অনার।
দাম ও বাজার
রোবট ফোনটি প্রথমে চীনের বাজারে ৯,৯৯৯ ইউয়ান থেকে বাজারজাত করা হয়েছে বলে প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এটি বাংলাদেশি বা মার্কিন বাজারে একই দামে পাওয়া যাবে কি না, তা স্থানীয় বাজারভিত্তিক মূল্য ও আনুষ্ঠানিক সরবরাহের ওপর নির্ভর করবে।
তবে এই ফোনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু দাম নয়—রোবটিক ক্যামেরার মতো জটিল যন্ত্রাংশ দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা এর সুবিধা কতটা কাজে লাগাতে পারবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
স্মার্টফোন ক্যামেরায় নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত
রোবট ফোনের মাধ্যমে অনার প্রচলিত ‘আরও ভালো সেন্সর’ বা ‘আরও বেশি মেগাপিক্সেল’-এর প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে স্মার্টফোন ক্যামেরায় মেকানিক্যাল মুভমেন্ট, AI এবং সিনেমাটিক ভিডিওগ্রাফি যুক্ত করার চেষ্টা করেছে।
ফলে ভবিষ্যতের স্মার্টফোনে শুধু ক্যামেরার সংখ্যা বা মেগাপিক্সেল নয়, ক্যামেরা কীভাবে নিজে থেকে ব্যবহারকারীর প্রয়োজন বুঝে নড়াচড়া করবে এবং পেশাদার মানের ভিডিও তৈরিতে কতটা সহায়তা করবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
—নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা