হারিকেন লালার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হাওয়াই, বিদ্যুৎহীন ৪২ হাজারের বেশি মানুষ
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ হাওয়াইয়ে শক্তিশালী হারিকেন লালা ঘিরে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭৫ মাইল বেগের বাতাস নিয়ে ক্যাটাগরি-১ হারিকেনটি বিগ আইল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের কাছ দিয়ে অতিক্রম করেছে। প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিতে রাজ্যজুড়ে ৪২ হাজার ৮৮৯-এর বেশি বিদ্যুৎ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন।
হারিকেনটির কেন্দ্র সরাসরি বিগ আইল্যান্ডে আঘাত না করলেও এর প্রভাবে দ্বীপটির বিভিন্ন এলাকায় ঝোড়ো বাতাস, মুষলধারে বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতীয় হারিকেন সেন্টার পরিস্থিতিকে ‘জীবনহানির ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে সতর্ক করেছে।
৪২ হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎহীন
ঝড়ের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিগ আইল্যান্ড। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৩১ হাজার ৭৯২ গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন ছিলেন। মাউই কাউন্টিতে বিদ্যুৎহীন গ্রাহকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ হাজার ২০৩।
হাওয়াইয়ান ইলেকট্রিক জানিয়েছে, ঝড়ের বাইরের অংশের প্রবল বাতাসে গাছ উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে হামাকুয়া উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৪২ মাইলজুড়ে সঞ্চালন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধারে সময় লাগতে পারে।
তবে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনে কর্মীরা কাজ শুরু করেছেন। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকায় বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের সংখ্যাও বাড়তে বা কমতে পারে।
১৪০ মাইল পর্যন্ত ঝোড়ো হাওয়া
হারিকেন লালার প্রভাবে হাওয়াইয়ের উঁচু এলাকাগুলোতে অত্যন্ত শক্তিশালী বাতাস রেকর্ড করা হয়েছে। মাউনা কেয়া এলাকায় বাতাসের ঝাপটার সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৪০ মাইল পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিগ আইল্যান্ড ও মাউইয়ের কিছু এলাকায় গত ১২ ঘণ্টায় ১২ থেকে ১৩ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টিও হয়েছে।
ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। কোনো কোনো অঞ্চলে মোট বৃষ্টিপাত ১০ থেকে ২৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিমানবন্দর ও বন্দর বন্ধ
ঝড়ের তীব্রতার কারণে হাওয়াইয়ের পরিবহন ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। বিগ আইল্যান্ডের হিলো ইন্টারন্যাশনাল ও কোনা বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হাওয়াই আইল্যান্ড, মাউই কাউন্টি ও কাউয়াইয়ের বিভিন্ন বাণিজ্যিক বন্দরও বন্ধ রাখা হয়েছে।
ফলে বহু ফ্লাইট ও নৌযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে থাকার এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরাসরি আঘাত না করেও বড় ঝুঁকি
লালার কেন্দ্র বিগ আইল্যান্ডে সরাসরি স্থলভাগে আঘাত করেনি। হারিকেনটির কেন্দ্র দ্বীপটির দক্ষিণে দিয়ে অতিক্রম করেছে। তবে ঝড়ের বাইরের অংশের শক্তিশালী বাতাস ও ভারী বৃষ্টি বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কেন্দ্র সরাসরি আঘাত না করলেও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে এসে বন্যা ও ভূমিধসের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। সমুদ্র উপকূলে বিপজ্জনক ঢেউ ও রিপ কারেন্টের আশঙ্কাও রয়েছে।
১৫৫ বছরের মধ্যে বিরল পরিস্থিতি
হারিকেন লালার আগমনকে হাওয়াইয়ের জন্য ঐতিহাসিক হুমকি হিসেবে দেখা হয়েছিল। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছিলেন, এটি বিগ আইল্যান্ডে সরাসরি আঘাত করলে প্রায় ১৫৫ বছরের মধ্যে প্রথম সরাসরি হারিকেন আঘাতের ঘটনা হতে পারত।
এর আগে ১৯৯২ সালের হারিকেন ইনিকি হাওয়াইয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে লালা মোকাবিলায় আগেভাগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয় স্থানীয় প্রশাসন।
বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান
হাওয়াইয়ের গভর্নর জশ গ্রিন বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে থাকার এবং জরুরি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে বন্যাপ্রবণ ও পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
এদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন, সড়ক পরিষ্কার এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে জরুরি কর্মীরা মাঠে রয়েছেন। তবে ঝড়ের প্রভাব পুরোপুরি কেটে না যাওয়া পর্যন্ত নতুন করে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা থাকছে।
সব মিলিয়ে, সরাসরি স্থলভাগে আঘাত না করেও হারিকেন লালা হাওয়াইয়ের জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। হাজারো মানুষ বিদ্যুৎহীন, পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত এবং বন্যা-ভূমিধসের ঝুঁকি অব্যাহত—এমন পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ এখন ক্ষয়ক্ষতি কমানো ও বিদ্যুৎ দ্রুত ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিচ্ছে।
-নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা