বয়স বাড়লেও সুস্থ থাকুন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে যেসব খাবার জরুরি
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এ সময়ে পর্যাপ্ত ও সুষম পুষ্টি শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে কোনো একটি খাবার একাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ‘বাড়িয়ে’ দিতে পারে—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। বরং নিয়মিত বৈচিত্র্যময় খাবার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফল-সবজি, প্রয়োজনীয় ভিটামিন-খনিজ এবং পর্যাপ্ত পানি—সব মিলিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
রঙিন ফল ও সবজি রাখুন খাবারের তালিকায়
বয়স্কদের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি থাকা জরুরি। এগুলো ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইবারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
কমলা, পেয়ারা, বেরি জাতীয় ফল, টমেটো, গাজর, মিষ্টি আলু, পালং শাক ও ব্রকলির মতো খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। NIA-এর মতে, ফল ও সবজি শরীরকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়ার পাশাপাশি ফাইবারও সরবরাহ করে।
বিশেষ করে ফলের ক্ষেত্রে জুসের পরিবর্তে গোটা ফল খাওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো।
মাছ ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
বয়স বাড়ার সঙ্গে পেশির ভর ও শক্তি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। মাছ, ডিম, মুরগি, ডাল, মটরশুঁটি, বাদাম, বীজ ও সয়া জাতীয় খাবার থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়।
NIA বলছে, প্রোটিন শরীরের টিস্যু তৈরি ও মেরামতের কাজে প্রয়োজন এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সালমন, ট্রাউটের মতো কিছু তৈলাক্ত মাছ প্রোটিনের পাশাপাশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও সরবরাহ করে।
ডিম ও দুধজাত খাবার
ডিমে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। অন্যদিকে দুধ, দই ও অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার থেকে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও অন্যান্য পুষ্টি পাওয়া যেতে পারে। বয়স্কদের হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এসব খাবার গুরুত্বপূর্ণ।
যারা দুধ পান করেন না, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ বিকল্প যেমন fortified soy beverage বেছে নিতে পারেন।
ভিটামিন বি১২-সমৃদ্ধ খাবার
বয়স বাড়ার সঙ্গে কিছু মানুষের খাবার থেকে ভিটামিন বি১২ শোষণে সমস্যা হতে পারে। মাংস, মাছ, মুরগি, দুধ এবং বি১২-সমৃদ্ধ ফোর্টিফায়েড ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল এর উৎস।
বি১২ শরীরের স্বাভাবিক রক্তকণিকা ও স্নায়ুর কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই বয়স্কদের খাদ্যতালিকায় এর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাদাম ও বীজ
বাদাম ও বীজে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইবার এবং বিভিন্ন খনিজ রয়েছে। কাঠবাদাম, আখরোট, পেস্তা, কুমড়ার বীজ বা সূর্যমুখীর বীজ পরিমিত পরিমাণে খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
তবে এগুলো ক্যালরিসমৃদ্ধ হওয়ায় পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। সম্ভব হলে অতিরিক্ত লবণ বা চিনি ছাড়া বাদাম বেছে নেওয়া ভালো।
ডাল ও শিমজাতীয় খাবার
মসুর ডাল, ছোলা, রাজমা, মটরশুঁটি ও অন্যান্য শিমজাতীয় খাবার একই সঙ্গে উদ্ভিদজাত প্রোটিন ও ফাইবারের উৎস। এগুলো বয়স্কদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
যারা কম মাংস খান বা নিরামিষভোজী, তাদের জন্য ডাল ও শিমজাতীয় খাবার বিশেষভাবে কার্যকর প্রোটিনের উৎস হতে পারে।
ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের দিকে নজর
বয়স্কদের মধ্যে ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন ডি পাওয়া যায় তৈলাক্ত মাছ, ফোর্টিফায়েড দুধ ও কিছু ফোর্টিফায়েড সিরিয়াল থেকে।
তবে ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি আছে কি না, তা ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই নিজের ইচ্ছায় উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পর্যাপ্ত পানি পানও জরুরি
বয়স্কদের ক্ষেত্রে সবসময় তৃষ্ণার অনুভূতি স্পষ্ট নাও হতে পারে। তাই শুধু তৃষ্ণা পেলেই পানি পান করার পরিবর্তে দিনের বিভিন্ন সময়ে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের অভ্যাস করা গুরুত্বপূর্ণ।
পানি ছাড়াও দুধ, চিনি ছাড়া চা বা অন্যান্য উপযুক্ত পানীয় খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা ভালো।
অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে শুধু কী খাবেন তা নয়, কী কম খাবেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বয়স্কদের খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত লবণ, যোগ করা চিনি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার কমিয়ে পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়ানো উচিত।
স্বাদ বাড়াতে অতিরিক্ত লবণের বদলে লেবুর রস, ধনেপাতা, তুলসি, ওরেগানো বা অন্যান্য মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে।
খাবারের বৈচিত্র্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, প্রতিদিন একই ধরনের খাবারের ওপর নির্ভর না করে ফল, সবজি, গোটা শস্য, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং দুধ বা fortified soy alternatives মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা তৈরি করা।
বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকের ক্ষুধা কমে যায়। আবার দাঁত বা গিলতে সমস্যা থাকলেও খাবারের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অল্প পরিমাণে হলেও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সাপ্লিমেন্ট কি সবার প্রয়োজন?
না। বেশিরভাগ বয়স্ক মানুষ বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবার থেকে প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ভিটামিন ও খনিজ পেতে পারেন। কোনো পুষ্টির ঘাটতি থাকলে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দিতে পারেন।
বিশেষ করে কিছু সাপ্লিমেন্ট ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার ভিটামিন বা খনিজ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করাই নিরাপদ।
খাবারের পাশাপাশি নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ
বয়স বাড়ার সঙ্গে খাদ্যবাহিত অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় খাদ্যজনিত সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তাই খাবার ভালোভাবে রান্না করা, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং বাসি বা সন্দেহজনক খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি।
সবশেষে, বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভালো রাখার জন্য কোনো একক ‘সুপারফুড’ নেই। বরং প্রতিদিনের খাবারে মাছ, ডিম, ডাল, বাদাম, দুধ বা fortified বিকল্প, বিভিন্ন রঙের সবজি ও গোটা ফল রাখার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান এবং অতিরিক্ত লবণ-চিনি কমানোর অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
-নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা