৬৬ বছর নখ না কেটে বিশ্বরেকর্ড, শ্রীধরের অবিশ্বাস্য কীর্তি
সাধারণ মানুষের কাছে নখ বড় হওয়া মানেই কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর তা কেটে ফেলা। কিন্তু ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনের বাসিন্দা শ্রীধর চিল্লাল নখ কাটেননি টানা ৬৬ বছর। একসময় তাঁর বাঁ হাতের পাঁচটি নখ এতটাই লম্বা হয়ে যায় যে, সবগুলো একসঙ্গে মাপলে দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৯০৯ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার বা ২৯ ফুট ১০ ইঞ্চি। এই অসাধারণ দৈর্ঘ্যই তাকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে দেয়।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর পুনেতে শ্রীধরের বাঁ হাতের নখ মাপা হয়। তখন তাঁর পাঁচটি নখের সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ছিল ৯০৯ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার—এক হাতে সবচেয়ে লম্বা নখের সর্বকালের রেকর্ড।
শিক্ষকের একটি কথাই বদলে দিয়েছিল জীবন
শ্রীধরের নখ বড় করার গল্পের শুরু ১৯৫২ সালে। তখন তিনি কিশোর। স্কুলে একদিন এক বন্ধুর অসাবধানতায় তাঁর শিক্ষকের একটি লম্বা নখ ভেঙে যায়। শিক্ষক বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ হন এবং শিক্ষার্থীদের বোঝান, লম্বা নখের যত্ন নেওয়া কতটা কঠিন।
ঘটনাটি শ্রীধরের মনে গভীর ছাপ ফেলে। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজের বাঁ হাতের নখ আর কাটবেন না। সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রেকর্ডধারীতে পরিণত করে।
এক হাতে নখের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ মিটার
শ্রীধরের পাঁচটি নখের প্রতিটিই ছিল অবিশ্বাস্য দীর্ঘ। গিনেসের পরিমাপ অনুযায়ী—
* বৃদ্ধাঙ্গুলির নখ: ১৯৭ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার
* মধ্যমার নখ: ১৮৬ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার
* অনামিকার নখ: ১৮১ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার
* কনিষ্ঠার নখ: ১৭৯ দশমিক ১ সেন্টিমিটার
* তর্জনীর নখ: ১৬৪ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার
সব মিলিয়ে দৈর্ঘ্য ৯০৯ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার। সবচেয়ে লম্বা ছিল বৃদ্ধাঙ্গুলির নখটি, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি।
নখ বড় রাখার সঙ্গে বাড়তে থাকে জীবনের নানা সমস্যা
এত লম্বা নখ নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন মোটেও সহজ ছিল না। শ্রীধরকে প্রতিদিনের কাজকর্মে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। বাঁ হাতের নখগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর হওয়ায় সামান্য অসতর্কতাতেও সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকত।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসকে তিনি জানিয়েছিলেন, ঘুমানোর সময়ও তাঁকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হতো। নখের কারণে হাত বেশি নড়াচড়া করা সম্ভব ছিল না; তাই রাতে নিয়মিত ঘুম ভেঙে হাতের অবস্থান পরিবর্তন করতে হতো।
পেশাগত জীবনেও এর প্রভাব পড়ে। শ্রীধর আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেছেন এবং বাঁ হাতের নখের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করতে হয়েছে। দীর্ঘদিন বাঁ হাত স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে না পারায় সেটি প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড নিশ্চিত
শ্রীধরের এই অদ্ভুত কিন্তু ব্যতিক্রমী কীর্তি ২০১৪ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে মাপা হয়। এরপর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁকে ‘Longest fingernails on a single hand ever’—অর্থাৎ এক হাতে সর্বকালের দীর্ঘতম নখের রেকর্ডধারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
তাঁর বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির ১৯৭ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার নখটিও পৃথকভাবে ‘সবচেয়ে লম্বা একক নখ’-এর রেকর্ড অর্জন করে।
৬৬ বছর পর শেষ হলো নখ না কাটার অধ্যায়
১৯৫২ সালে শুরু হওয়া সেই যাত্রার অবসান ঘটে ২০১৮ সালে। দীর্ঘ ৬৬ বছর পর শ্রীধর তাঁর বিখ্যাত নখগুলো কেটে ফেলেন। তখন পাঁচটি নখের সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ছিল ৯০৯ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার।
নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে রিপলিজ বিলিভ ইট অর নট! জাদুঘরে নখগুলো কাটার আয়োজন করা হয়। পরে সেগুলো প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।
রেকর্ড শেষ হলেও গল্প রয়ে গেছে
শ্রীধরের নখ এখন আর তাঁর হাতে নেই। কিন্তু ৬৬ বছরের সেই অভ্যাস এবং এর মাধ্যমে তৈরি বিশ্বরেকর্ড তাঁকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা দিয়েছে।
একটি ছোট্ট স্কুল-ঘটনা থেকে শুরু হয়েছিল যে সিদ্ধান্ত, তা পরিণত হয়েছিল কয়েক দশকের এক অসাধারণ ব্যক্তিগত অভিযানে। তাঁর নখের দৈর্ঘ্য যেমন অবিশ্বাস্য, তেমনি আরও বিস্ময়কর হলো—একটি সিদ্ধান্তকে তিনি ৬৬ বছর ধরে ধরে রেখেছিলেন।
আজও শ্রীধর চিল্লালের নাম উচ্চারিত হয় বিশ্বের দীর্ঘতম নখের রেকর্ডের সঙ্গে। আর তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, মানুষের অদ্ভুতুড়ে কোনো অভ্যাসও কখনো কখনো বিশ্বরেকর্ডের ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারে।
-নিউ ইয়র্ক ভয়েস বাংলা